সপ্তাহের নফল নামাজ সমূহ – দৈনন্দিনের নফল নামাজগুলো জেনে নিন

নবী কারীম সাঃ তার প্রিয় উম্মতগণের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের অতিরিক্ত বেশ কিছু সুন্নতে যায়েদা এবং নফল নামাজ শিখিয়ে দিয়েছেন সেগুলোর মধ্যে আওয়াবিন, ইশরাক, তাহাজ্জুদ, সালাতুল হাজত ও সালাতুত তাসবিহের নামাজ অন্যতম।

এছাড়া বছরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাতে শবে কদর, শবে মেরাজ ও শবে বরাতের মত বিশেষ নফল নামাজও শিখিয়ে দিয়েছেন। যেন এসমস্ত ইবাদত করে বান্দা তার প্রভুর সান্নিধ্য হাসিল করতে পারে।

সপ্তাহের নফল নামাজ সমূহ

আপনি কি জানেন উল্লেখ্য নাওয়াফেল ছাড়াও সপ্তাহের প্রত্যেক দিনে ও রাতে আরোও যে নফল নামাজ রয়েছে? হয়তো জানেন না তাইতো? যদি তাই হয় এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য, কারণ আমরা এই পোস্টটিতে সপ্তাহের সকল নফল নামাজ সমূহ অর্থাৎ দৈনন্দিন [শুক্র- শনি- রবি- সোম- মঙ্গল- বুধ ও বৃহস্পতিবারে দিনেও রাতে যে নফল নামাজ পড়তে হয় তা জানাবো ইনশাল্লাহ।

শুক্রবার রাতের নফল নামাজ

সাহাবী হযরত আনা ইবনে মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছে্‌ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মাগরিব ও এশার ওয়াক্তের মধ্যবর্তী সময় ১২ রাকাত নফল নামাজ আদায় করতে হয়। এ নামাজে সুরা ফাতেহার পরে যে কোন সূরা মিলিয়ে পড়া যায়।

ফজিলত: যে ব্যক্তি নামাজ আদায় করবে, তার জন্য আল্লাহ তাআলা বেহেশতের মধ্যে একটি উঁচু বালাখানা তৈরি করে দিবেন দিবেন। সে যেন সমস্ত মুসলমানের পক্ষে সদকা দিল। আল্লাহ পাক তাকে মাফ করে দেবেন। (পূর্ণাঙ্গ নামাজ শিক্ষা আশরাফ আলী থানবী রহঃ)

নিয়তঃ আমি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর ওয়াস্তে দু রাকাত নফল নামাজের নিয়ত করলাম “আল্লাহু আকবার” এটি সাধারণ নফল নামাজের নিয়ত। এছাড়া অন্যান্য নফল নামাজের ক্ষেত্রে সেই নামাজের নিয়ত করবেন।

শুক্রবার দিনের নফল নামাজ

হযরত মুজাহিদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেনঃ জুমার দিনে জোহর ও আসরের মধ্যবর্তী সময় দু’রাকাত নফল নামাজ পড়া যায়। তার প্রথম রাকাতে সূরা ফাতেহার পর একবার আয়াতুল কুরসি ও ২৫ বার সূরা ফালাক এবং দ্বিতীয় রাকাতে ১ বারে সূরা ইখলাস ও ২০ বার সূরা ফালাক পড়তে হয়।

ফজিলত: নামাজ শেষে নিম্নের দোয়াটি ৫০ বার পড়তে হয়। যে ব্যক্তি এই নামাজ আদায় করবে সে আল্লাহকে স্বপ্নে না দেখে বেহেশতে স্থীয় স্থান না দেখে মৃত্যুবরণ করবে না। (পূর্ণাঙ্গ নামাজ শিক্ষা আশরাফ আলী থানবী রহঃ)

দোয়াটি এইঃ

لا حول ولاقُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ

উচ্চারণঃ লা-হাওলা ওয়া লা- কুওয়্যাতা ইল্লা- বিল্লা-হিল আলিয়্যিল ‘আযীম।

শনিবার রাতের নফল নামাজ

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেনঃ এই রাতে যে কোন সময় ২০ রাকাত নামাজ পড়া যায়। এর প্রতি রাকাতে সূরা ফাতেহার পর ৫০ বার সূরা ইখলাছ এবং ১ বার করে সুরা ফালাক ও নাস পড়তে হয়। নামাজের পর ১০০ বার করে ইস্তেগফার ও দুরুদ শরীফ পড়তে হয়। অতঃপর নিম্নের দোয়াটি ১০০ বার পড়ে তৎপর তার পরের দোয়াটি ১০০ বার পড়তে হয়।

প্রথম দোয়াটি হলোঃ

لا حول ولاقُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ

উচ্চারণঃ লা-হাওলা ওয়া লা- কুওয়্যাতা ইল্লা- বিল্লা-হিল আলিয়্যিল ‘আযীম।

দ্বিতীয় দোয়াটি হলঃ

أَشْهَدُ أَنْ لا إله إلا الله وَاشْهَدُ أن أدَمَ صَفِى اللهِ وَفِطْرَتَهُ وَإبْرَاهِم خَلِيلُ اللهِ عَزَّ وَجَلٌ – وَمُوسَى كَلِيمُ اللهِ تَعَالَى وَعِيسَى رُوحُ سُبْحَانَهُ- وَمُحَمَّد حَبِيبُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ

উচ্চারণঃ আশহাদু আল্লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশহাদু আন্না আ-দামু সফীউল্লা-হি ওয়া ফিতরাতুহু ওয়া ইব্রাহিমা খলিলুল্লাহি আজ্জা ওয়াজাল্লা-ওয়া মুসা কালিমুল্লাহি তায়ালা ওয়া ইসা রুহু সুবাহানাহু-ওয়া মুহাম্মাদ হাবিবুল্লাহি আজ্জা ওয়াজাল্লা।

শনিবার দিনের নফল নামাজ

হযরত সাঈদ (রাঃ) হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেনঃ শনিবার দিবসের ভেতরে যে কোনো সময় চার রাকাত নামাজ পড়া যায়। এ নামাজ এক সালামে পড়তে হয়। এর প্রতি রাকাতে সূরা ফাতেহার পরে ৩ বার সূরা কাফিরুন মিলিয়ে পড়তে হয়। নামাজ শেষে আয়াতুল কুরসি পড়তে হবে।

ফজিলত: নামাজী ব্যক্তি এক বছর রোজা রাখা তুল্য সওয়াব লাভ করবে এবং একটি হজ ও ওমরার সমান সওয়াব পাবে। আর কেয়ামতের দিন আরশের ছায়ায় নবী ও শহীদদের সঙ্গে স্থান লাভ করবে। নামাজ শেষে নিজের ও পিতা মাতার গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করতে হবে।

রবিবার রাতের নফল নামাজ

হযরত আমস (রাঃ) হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেনঃ রবিবার রাতের মধ্যে যে কোন সময় এক নিয়্যতে চার রাক’আত নামাজ পড়তে হবে। এ নামাজের ১ম রাক’আতে সূরা ফাতিহার পরে ১০ বার সূরা ইখলাছ দ্বিতীয় রাক’আতে ২০ বার, তৃতীয় রাক’আতে ৩০ বার এবং চতুর্থ রাক’আতে ৪০ বার পড়তে হবে।

ফজিলত: নামাজের পরে সূরা ইখলাছ ৭৫ বার’ ইস্তিগফার ৭৫ বার এবং দুরূদ শরীফ ৭৫ বার পড়তে হবে। নামাজের পরে আল্লাহর নিকট গুনাহ মার্জনার জন্য প্রার্থনা করতে হবে । তিনি তার দিলের বাসনা পূর্ণ করে দেবেন।

রবিবার দিনের নফল নামাজ

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ রবিবার দিবসে যে কোন সময় এক নিয়্যতে চার রাক’আত নামাজ আদায় করা যায়। এর প্রতি রা‘আতে সূরা ফাতিহার পরে সূরা বাকারার “আমানার রাসূলু” হইতে “আলাল ক্বাওমিল কাফিরীন” পর্যন্ত পড়তে হয়।

ফজিলত: এই নামাজীর আমল নামায় খৃষ্টানদের সংখ্যার তুল্য সওয়াব লিখা হবে এবং নবীর তুল্য ছাওয়াবও লিখা হবে আর একটি হজ এবং ওমরার তুল্য ছাওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে। এটা ব্যতীত প্রতি রাকায়াতের বদলে ১০০০ রাকাতের সোয়াব লেখা হবে এবং বেহেশতের ভেতরে এর প্রত্যেকটি অক্ষরের বদলে মেশকের শহর লাভ করবে। নামাজের পরে নিজের ও পিতা-মাতার গুনাহ মার্জনা জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করবে।

সোমবার রাতের নফল নামাজ

বর্ণিত আছে, এ রাতে যে কোন সময় ১২ রাক’আত নামাজ পড়া যায়। এর প্রত্যেক রাক’আতে সূরা ফাতিহার পরে ৫ বার করে সূরা ‘নসর’ (ইযাজা) পড়তে হবে।

ফজিলত: এ নামাজ আদায়কারীকে আল্লাহ তা’আলা বেহেশতের মধ্যে পৃথিবীর সমান ৭টি মহল দান করবেন।

সোমবার দিনের নফল নামাজ

হযরত আবু জোবায়ের (রাঃ) হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেনঃ এ দিবসে চাশতের ওয়াক্তে দু’ রাক’আত নামাজ পড়া যায়। তার প্রত্যেক রাক’আতে সূরা ফাতিহার পরে ১ বার করে আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক ও সূরা নাস মিলিয়ে পড়তে হয়। নামাজের পরে ১০ বার ইস্তিগফার ও ১০ বার দুরূদ শরীফ পাঠ করতে হয়।

ফজিলত: আল্লাহ পাক এ ব্যক্তির সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন ইনশা-আল্লাহ্।

মঙ্গলবার রাতের নফল নামাজ

বর্ণিত আছে, মঙ্গলবার রাতে যে কোন সময় ২ রাক’আত নামাজ পড়া যায়। এই নামাজের প্রথম রাক’আতে সূরা ফাতিহার পর ১০ বার সূরা ফালাক এবং দ্বিতীয় রাক’আতে ১০ বার সূরা নাস পাঠ করতে হয়।

ফজিলত: এ ব্যক্তির জন্য ৭০ সহস্র ফেরেশতা দুনিয়ায় অবতীর্ণ হয়ে কেয়ামত পর্যন্ত তার আমলনামায় সওয়াব লিখতে থাকবে।

মঙ্গলবার দিনের নফল নামাজ

হযরত ইয়াজীদ রুফায়ী (রাঃ) হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেনঃ এ দিবসে চাশতের ওয়াক্তে ১০ রাক’আত নামাজ আদায় করা যায়। এ নামাজের প্রত্যেক রাক’আতে সূরা ফাতিহার পরে একবার আয়াতুল কুরসী এবং তিনবার সূরা ইখলাছ পড়তে হয়।

ফজিলত: এ ব্যক্তির আমল নামায় সত্তর দিবস পর্যন্ত কোন গুনাহ লিপিবদ্ধ করা হবে না। আর ঐ ব্যক্তি এ দিবসে মৃত্যুবরণ করলে তাকে আল্লাহ তা’আলা শহীদী দরজা প্রদান করবেন এবং তাহার ৭০ বৎসরের পাপ মোচন করে দেবেন।

বুধবার রাতের নফল নামাজ

হযরত আবু সালেহ (রাঃ) হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেনঃ এ রাতে মাগরিব ও এশার ওয়াক্তের মধ্যবর্তী সময় দু’ রাক’আত নামাজ পড়া যায়। এ নামাজের প্রত্যেক রাক’আতে সূরা ফাতিহার পর ৫ বার করে আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়তে হবে। ১৫ বার ইস্তিগফার পড়ে এর সওয়াব মাতা-পিতার রূহের প্রতি বখশিশ করে দেবে।

ফজিলত: এর দ্বারা মাতা-পিতার হক আদায় হয়ে যাবে। আল্লাহ তা’আলা এ ব্যক্তিকে সিদ্দীকীন ও শহীদানের তুল্য ছাওয়াব প্রদান করবেন ইনশা-আল্লাহ্।

বুধবার দিনের নফল নামাজ

হযরত আবু ইদ্রিস খাত্তালানী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, এ দিবসে চাশতের ওয়াক্তে ১২ রাক’আত নফল নামাজ আদায় করা যায়। এর প্রতি রাক’আতে সূরা ফাতিহার পর ১ বার আয়াতুল কুরসী এবং তিন বার করে সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক্ক, ও সূরা নাস পড়তে হয়।

ফজিলত: আসমানের ফেরেশতারা এ নামাজীকে ডেকে বলে, আপনি নতুন ভাবে ইবাদত আরম্ভ করুন। আপনার পূর্ববর্তী গুনাহ্ আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাক তাঁর কবর আজাব ও সংকীর্ণতা এবং অন্ধকার দূর করে দেবেন। তাঁর অমলনামা নবীদের আমলনামার ন্যায় দেখা যাবে। আল্লাহ পাক কেয়ামতের দিন তার আজাব মাফ করে দেবেন।

বৃহস্পতিবার রাতের নফল নামাজ

হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ এ রাতে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময় ১২ রাক’ আত নফল নামাজ পড়া যায়। এর প্রতি রাক’ আতে সূরা ফাতিহার পরে ১০ বার করে সূরা ইখলাছ মিলিয়ে পড়তে হয়।

ফজিলত: এ নামাজী ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তা’আলা ১২ বছরের রোজার তুল্য এবং ১২ বছরের রাত ইবাদতের তুল্য ছাওয়াব দান করবেন।

বৃহস্পতিবার দিনের নফল নামাজ

বৃহস্পতিবার যোহর ও আছরের মধ্যবর্তী সময় দু রাক’আত নফল নামাজ আদায় করা যায়। এ নামাজের প্রথম রাক’আতে ১০০ বার আয়াতুল কুরসী এবং দ্বিতীয় রাক’আতে ১০০ বার সূরা ইখলাছ পড়তে হয়। নামাজের পরে ১০০ বার দুরূদ শরীফ পড়তে হয়।

ফজিলত: এ ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’আলা রজব, শাবান ও রমজান মাসের রোজার সমপরিমান ছওয়াব দান করবেন এবং কা’বা শরীফ তওয়াফকারী হাজীদের তুল্য সওয়াব প্রদান করবেন। তাছাড়াও সমস্ত মু’মীন বান্দাদের সংখ্যাতুল্য ছাওয়াব দান করবেন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *